Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > পাক-ভারত উত্তাপ > ভারত-পাকিস্তানের ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধ

ভারত-পাকিস্তানের ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধ

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। মাসকাওয়াথ আহসান ।।


মাসকাওয়াথ আহসান পাকিস্তানের করাচীতে বসবাসরত বাংলাদেশি সাংবাদিক। দীর্ঘদিন জার্মান বেতার ডয়েচে ভেলেতে কাজ করেছেন। বর্তমানে ই-সাউথএশিয়া’র প্রধান সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।


একটি অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ভারত-পাকিস্তান। প্রায় সত্তুর বছর ধরে রাষ্ট্রদুটি পরস্পরের মধ্যে নজিরবিহীন শত্রুতা জারি রেখে; কৃত্রিম সেনাগুরুত্ব ধরে রাখতে বার বার যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে; দুটি দেশের সেনাবাজেট সর্বোচ্চ পর্যায়ে রেখেছে; আর সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দে সবচেয়ে অবহেলা করেছে। কৃত্রিম যুদ্ধ ও উগ্রজাতীয়তাবাদ প্রসূত হাওয়াই আবেগ বিক্রি করে অর্থকরি লাভালাভ ঘরে তুলেছে রাজনৈতিক ও সেনা প্রশাসন; আর সাংবাদিকতা নৈতিকতাহীন মিডিয়ার কাল্পনিক যুদ্ধে ক্ষতির সম্মুখীন করেছে স্বাভাবিক জন জীবন-যাপন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সব হারিয়ে শূণ্য অবস্থান থেকে জার্মানি সহ ইউরোপের দেশগুলো যে সময়ে আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে; জনমানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দিয়ে কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তুলেছে; সে সময়টা ভারত-পাকিস্তানের নীতি-নির্ধারকরা ব্যস্ত থেকেছে যুদ্ধের আয়োজনে ও এ থেকে মুনাফা কুড়ানোতে।

মঙ্গলবার রাতে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে ভারতীয় যুদ্ধ বিমান পাকিস্তানে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে হামলার ছলে পাকিস্তানের আকাশ সীমা লংঘন করে এবারের যুদ্ধের সূচনা করেছে। ভারতীয় কতৃপক্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ জায়েশ-ই-মুহাম্মদের প্রশিক্ষণ ঘাঁটি উড়িয়ে দিয়ে ব্যাপক হতাহতের কৃতিত্ব দাবি করতেই; ভারতীয় মিডিয়ার একটি অংশ সে দাবির পক্ষে প্রমাণ না খুঁজে; সাংবাদিকতা নৈতিকতার প্রথম পাঠ অগ্রাহ্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপেশাদার ‘গুজব ও উত্তেজনা’ রটনাকারীর মত যুদ্ধ বিজয় উদযাপনে মাতোয়ারা হয়েছে।

পাকিস্তানের অবস্থাটা সেখানে এমনিতে নাচুনি বুড়ি; তার উপর ঢাকের বাড়ি যেন; যুদ্ধ তৃষ্ণা আর নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে আগুয়ান হয়েছে। বুধবার ভোরেই তারা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের আকাশ সীমায় আঘাত হেনে একটি ভারতীয় যুদ্ধ জাহাজ ভূপাতিত করেছে। গ্রেফতার করেছে ভারতীয় এক বায়ু সেনাকে। (পাকিস্তান দুটি ভারতীয় যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত করা ও দুজন বায়ুসেনাকে গ্রেফতারের কথা দাবি করলেও এখন পর্যন্ত ভারত তাদের একটি যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত হওয়া ও একজন বায়ু সেনা ফিরে না আসা নিশ্চিত করাতে 
কেবল একটি যুদ্ধ-বিমান ও একজন বায়ুসেনা গ্রেফতারের বিষয়টি এ লেখায় উল্লেখ করলাম।)

এ যেন ভারত-পাকিস্তান হকি খেলা। মঙ্গলবার ভারত পাকিস্তানের ডি-বক্সে ঢুকে গোল করতে ব্যর্থ হবার পর বুধবার পাকিস্তান একটি গোল করেছে; এমন পুলকে পাকিস্তানের মিডিয়া যুদ্ধজয়ের আনন্দ উদযাপন শুরু করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপেশাদার উত্তেজনা ও গুজব প্রচারকারী লোকজনের মত। এর মাধ্যমে পাকিস্তান ও ভারতের মিডিয়া উভয়েই নৈতিকতার পরীক্ষায় যে শূণ্য পেলো তা বলাই বাহুল্য।

ভারতে সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদির যুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদের উত্তেজনা বিক্রির মওকা প্রয়োজন ছিলো। ফলে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামার আত্মঘাতি হামলায় ভারতের নিরাপত্তা কর্মীদের নিহত হবার ঘটনায়; কেবলমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে দায়ী করে রণহুংকার দিয়েছিলেন তিনি। আসন্ন নির্বাচনি প্রচারণায় সামরিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য পাকিস্তানে যুদ্ধ বিমান পাঠিয়ে জায়েশ-ই-মুহাম্মদের প্রশিক্ষণ ঘাঁটি উড়িয়ে দেবার দাবি করলেন প্রমাণ ছাড়াই। অথচ সৌদি যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমানের পাকিস্তান সফর সামনে রেখে পুলওয়ামায় হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান; এটি খুব অযৌক্তিক একটি অভিযোগ। ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে যে অতিথি পাকিস্তানে যাবেন; তার সফর সামনে রেখে পাকিস্তান বিতর্কিত পরিবেশ তৈরি করবে; মোদির মত অভিজ্ঞ রাজনীতিকের কাছ থেকে এতো দুর্বল হাইপোথিসিস আশা করা যায় না। বলিউড চলচ্চিত্রের ইলিউশানের জগত; ইলেকট্রনিক মিডিয়া দিয়ে সৃষ্টির চেষ্টায় খুব দুর্বল চিত্রনাট্য এটি।

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ঘটনাপ্রবাহের মাঝেই সেখানকার অশান্ত অবস্থার কারণ ও প্রতিকার নিহিত রয়েছে; এমন বাস্তব চিন্তা ছাড়া প্রমাণহীন ব্লেম গেম থেকে কোন সমাধান আসার কথা নয়।

এই যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে আসন্ন নির্বাচনে মোদির দল জিতবেই এমন কোন নিশ্চয়তা নেই; যেমন অতীতে কারগিল যুদ্ধের আয়োজন এর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কাজে আসেনি। মঙ্গলবার রাতে ভারতীয় যুদ্ধ বিমান জায়েশ-ই-মুহম্মদের প্রশিক্ষণ ঘাঁটি উড়িয়ে দিতে পারলে; এ হামলার একটা যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যেতো। সুর্নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যস্থির না করে এমন নিষ্ফল বিমান হামলা ভারতের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের অপচয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান অনেক জনতুষ্টিকর কথা বলে ক্ষমতায় এলেও; এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশা ছাড়া তেমন কিছু উপহার দিতে পারেননি। ফলে ভারতের এই যুদ্ধ-নাটক তাকে যুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদ বিক্রির সুযোগ করে দিলো। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে ইমরানের দল পিটি আই হারবে; এমন পরিস্থিতিতে মোদির এই যুদ্ধ রথ ইমরান খানের জনপ্রিয়তায় মনিকাঞ্চন যোগের মতো।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে গত দু’দিনে ভারত-পাকিস্তান যে যুদ্ধাবস্থা; তার নিট ফল উভয় দেশের শেয়ার বাজারে দরপতন, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দাবস্থা; স্বাভাবিক জীবন-যাপন বিঘ্নিত হওয়া। আর উভয় দেশে কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদীর নিষ্ফল আস্ফালন; রাতারাতি দেশপ্রেমিক সেজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রামীণ বাহাদুরি দেখানোর সত্তর বছরের উত্তরাধিকারের নবায়ন। পারমানবিক শক্তিধর ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে যে, অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিকভাবে ভয়ংকর পরিণতির দিতে এগিয়ে যাবে; এই কমনসেন্স বর্জিত নীতি-নির্ধারক, সেনা প্রশাসন, আর অবিমৃষ্য উগ্রজাতীয়তাবাদীদের পক্ষে তা খুব সম্ভবত উপলব্ধি করাই অসম্ভব।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: