পড়তে পারবেন 4 মিনিটে Samsungtv

‘মান্নাসাহেব এই এলাকায় একসময় নৌকার ভোট চেয়েছেন, আওয়ামী লীগ করেছেন। এখন তো তাকে নিয়ে ভোটারদের কাছে যেতেও আমরা বিব্রত হবো।’

আবদুর রাজ্জাক, শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক

‘আওয়ামী দুঃশাসন থেকে শিবগঞ্জের মানুষকে মুক্ত করার এই লড়াইয়ে বিএনপি-জামায়াতসহ ঐক্যফ্রন্টভুক্ত সব দলের নেতাকর্মীরাই একজোট হয়ে কাজ করবে।’

মাহমুদুর রহমান মান্না, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক

মেহেরুল সুজন
অতিথি প্রতিবেদক





বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক বাজার থেকে এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকতেই কিচক-মোসলেমগঞ্জ সড়কের পাশের একটি বাড়ির দেয়ালে নৌকা প্রতীকে ভোটচেয়ে মান্নার সেই সময়কার নির্বাচনী প্রচারণা এখনো মোছে নি। স্থানীয়রা জানান, ২০০১সালের নির্বাচনের সময় কিচক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা সামসুল ইসলাম স্থানীয় শাহজাহানের বাড়ির দেয়ালে এই প্রচারণাটি আঁকেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না
কিচক-মোসলেমগঞ্জ সড়কের পাশে এখনো মাহমুদুর রহমান মান্নার পক্ষে নৌকা প্রতীকের দেয়াললিখন শোভা পাচ্ছে।

বগুড়া-২ আসনের প্রত্যন্ত অনেক এলাকায় একসময়ের আওয়ামী লীগের এই নেতার পক্ষে নৌকা মার্কার প্রচারণায় দেয়াল লিখন রয়ে গেছে এখনো। আর সেইসব দেয়ালগুলোর মতোই বিএনপি নেতারাও ভুলতে পারছেন না, মাহমুদুর রহমান মান্নার অতীতপরিচয়। নাগরিক ঐক্য গঠন করে সদ্য ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয়া এই নেতা জোটের স্বার্থে বগুড়া-২থেকে মনোনয়ন পেলে তা ভালোভাবে নেবেন না বিএনপির স্থানীয় নেতারা।

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এসএম তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে সরকারি দলের মামলা-হামলা-নির্যাতনে একপ্রকার ফেরারী জীবন কাটাতে হচ্ছে। দল এবার নির্বাচনে যাচ্ছে-এমন খবরে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছিলেন বেশ। কিন্তু ধানের শীষ প্রতীক দলের বাইরে চলে যাবার আশঙ্কায় খানিকটা ভাটা পড়েছে তাতে।’

উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আওয়ামী লীগে দীর্ঘদিন যারা তার সাথে রাজনীতি করেছেন তারা তো তারদুর্বল দিকগুলো ভালো করেই জানেন। ভোটের মাঠে সেগুলো নিয়ে যখন আওয়ামী লীগ প্রচারণাচালাবে, তখন ধানের শীষ জয় নিয়ে আমাদেরকেও সংশয়ে থাকতে হবে।’

মূল চ্যালেঞ্জ যেখানে:

প্রথম সংসদ নির্বাচনে বগুড়ার এই আসনে আওয়ামী লীগ নেতা মোজাফ্ফর হোসেন সংসদ সদস্য হন। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনেই এটি চলে যায় বিএনপির দখলে।পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে হারিয়ে আসনটি দখলে নেয় জামায়াত। এরপর থেকে নবম সংসদপর্যন্ত আবারো বিএনপির টানা দখলে থাকে আসনটি। সর্বশেষ দশম সংসদ নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসনটি দখলে পায় জাতীয় পার্টি। ভোটের হিসেবে এই আসনটি তাইস্থানীয় রাজনীতিকদের কাছে বিএনপি-জামায়াতের আসন হিসেবেই পরিচিত। নির্বাচনে মান্নাধানের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হলে এই দুটি দলের স্থানীয় নেতাদের ভূমিকানিজের পক্ষে নিয়ে আসা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে তার জন্য। কারণ, মান্না ধানের শীষপ্রতীক নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়ে আসছেন নির্বাচনে-এমন খবরে এরইমধ্যে হতাশাকাজ করতে শুরু করেছে উপজেলার বিএনপি শিবিরে। দীর্ঘদিন ধরে দখলে রাখা আসনটি নিজদলের বাইরে চলে যাবে-এমন সম্ভাবনায় চাপা অসন্তোষও দানা বাঁধতে শুরু করেছে বিএনপিরনেতাকর্মীদের মাঝে। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এসএম তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপির স্থানীয় কোনো প্রার্থী হলে নেতাকর্মীরা জীবনবাজি রেখে তাকেবিজয়ী করতে কাজ করতে এই প্রতিকূল পরিবেশেও। জোটগত কারণে এখন ভোটের মাঠে থাকলেওঅন্য দলের প্রার্থী হওয়ায় কর্মীদের মধ্যে সেই উদ্যম পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে বেশ।বিএনপির নিজস্ব এলাকা হলেও তাই জয় নিয়েও শঙ্কা কাজ করবে।’

রুষ্ট জামায়াতও:

জামায়াত ভোটের অঙ্কে বিগত সময়ের চেয়েও এখন শিবগঞ্জে বেশ
শক্তিশালী। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে ২৫ হাজারেরও বেশি ভোটে বিএনপির প্রার্থীকে
পরাজিত করে চেয়ারম্যান হন জামায়াত নেতা মাওলানা আলমগীর হুসাইন। ওই নির্বাচনে ৫০
হাজারেরও বেশি ভোটে বিএনপির প্রার্থীকে হারিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া
আবদুস সামাদও জামায়াত নেতা। জোটের রাজনীতিতে তাই এবার শুরু থেকেই আসনটির দাবিদার
জামায়াত। মান্নাকে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী করা হলে সেটিকে ভালোভাবে নেবে না
জামায়াতও। এরইমধ্যে জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান সহকারী
রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে মনোনয়নপত্র তুলে জমা দিয়েছেন। শাহাদাতুজ্জামান
উত্তরকালকে বলেন, এই আসনে নির্বাচনের জন্য দলীয়ভাবে আমরা অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি
নিয়ে রেখেছি। উপজেলার স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে আমাদের প্রার্থীরা ব্যাপক ব্যবধানে
জয়ী হয়েছেন। কাজেই জোটের রাজনীতিতে ইতিবাচক ফলাফল আনতে আমরা এবার এই আসনের যোগ্য
হকদার।

মান্না কখন কোথায়:

১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার
আগে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের একাংশের প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে বগুড়ার
শিবগঞ্জে গণসংযোগ শুরু করেছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা মাহমুদুর রহমান মান্না। কিছুদিন
পরেই বাসদ থেকে বেরিয়ে জনতা মুক্তি পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন তিনি। শেষমেষ সেই
দলের হয়ে কাস্তে প্রতীক নিয়ে পঞ্চম সংসদে ভোটের মাঠে নামনে বগুড়া-২ সংসদীয় আসনে। পঞ্চম
সংসদে অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতীক পাল্টানো মাহমুদুর রহমান মান্না অবশ্য সপ্তম আর
অষ্টম সংসদ নির্বাচনে লড়াইয়ে ছিলেন একই প্রতীক আওয়ামী লীগের নৌকা নিয়ে। মাঝের দুটি
সংসদ নির্বাচনে আর প্রার্থী হন নি তিনি। এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতীক
ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বগুড়ার ওই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয়
ঐক্যফ্রন্টের এই শীর্ষ নেতা। দেশের রাজনীতিতে নানান সময় আলোচিত এই রাজনীতিকের
বারবার দল কিংবা প্রতীক পাল্টানোর বিষয় নিয়ে তার জন্মভিটা শিবগঞ্জে
আলোচনা-সমালোচনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। তবে এবার সেই আলোচনা ভিন্নমাত্রা পেয়েছে
মান্নার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার খবর চাউর হবার পর থেকেই। ১৯৯৬ সালে
সপ্তম সংসদ নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগে যোগদান করে আবারো নিজ এলাকায় নির্বাচনী
প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন মান্না। 

ভোট নিয়ে নাগরিক ঐক্যের ভিন্ন হিসাব:

শিবগঞ্জ উপজেলা নাগরিক ঐক্যের সদস্য সচিব সাইদুর রহমান
সাগর উত্তরকালকে বলেন, মান্না নিজের স্বার্থের কারণে কোনোদিন দল পাল্টান নি। সবসময়
আদর্শিক কারণে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকতে চেয়েছেন বলেই তাকে দল
পাল্টাতে হয়েছে। এই শিবগঞ্জে একসময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে
যেতো। সবমিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি ভোট পেতো না আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ কিংবা স্থানীয়
সরকারের নির্বাচনগুলোতে। মান্না আওয়ামী লীগে যোগদানের পর দিনরাত এলাকা এলাকা ঘুরে
এই ভোটের পরিমাণকে ৫০ হাজারের কোঠায় নিয়ে গেছেন।‘ এই
উদাহরণের সূত্র ধরে উপজেলা নাগরিক ঐক্যের নেতা আবদুল ওয়াহাবের দাবি, ‘নিজের হাতে তৈরি করা এসব আওয়ামী লীগ কর্মীরা এখনো মান্নাকে
ভালোবাসেন। কাজেই ঐক্যফ্রন্টের ভোটগুলোর সাথে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এই
ভোটগুলোও মান্নার প্রতীকে পড়বে। দল কিংবা প্রতীকে বাইরে শিবগঞ্জের কৃতী রাজনীতিবিদ
হিসেবেও মান্নার ভোট অনেক বেশি হবে বলেও দাবি নাগরিক ঐক্যের এই নেতার। অবশ্য,
নির্বাচনের আগ মুহূর্তে গিয়ে জোট শরীকদের এসব মনোভাব থাকবে না বলেই আশাবাদ
ঐক্যফ্রন্ট নেতা মাহমুদুর রহমানের। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী
দুঃশাসন থেকে শিবগঞ্জের মানুষকে মুক্ত করার এই লড়াইয়ে বিএনপি-জামায়াতসহ
ঐক্যফ্রন্টভূক্ত সব দলের নেতাকর্মীরাই একজোট হয়ে কাজ করবে।’ নৌকা প্রতীক ছেড়ে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রসঙ্গে তিনি
বলেন, ‘এটি নিয়ে আমার কোনো দুঃখবোধ নেই, কোনো অপরাধবোধ নেই।
আমি যেটা করছি, রাজনীতির দিক থেকে সেটি ঠিকই করছি। তারই অংশ হিসেবে নির্বাচন করছি,
সেটাও ঠিকই করছি।’
মেহেরুল সুজন উত্তরাঞ্চলের একজন গণমাধ্যমকর্মী। কাজ করেছেন রাজশাহী, রংপুর ও বগুড়া জেলায়। খবরের কাগজ সমকাল দিয়ে শুরু করে সময় সংবাদ হয়ে এখন তিনি যমুনা টেলিভিশনের বগুড়া ব্যুরো প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। উত্তরকালের বিশেষ অনুরোধে পাঠকদের জন্য এই প্রতিবেদন তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
Berger Weather Coat