বিশেষ প্রতিনিধি

যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবমুক্ত থাকছে না নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সমাবেশের মঞ্চে নিবন্ধন নিষিদ্ধ এই দলের নেতাদের আপাতত দেখা না গেলেও রাজনৈতিকভাবে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেছে দলটি। ঐক্যফ্রন্টের আইনজীবীদের সংবাদ সম্মেলনে তারা প্রকাশ্যেই অংশ নিয়েছেন। ৬ নভেম্বর রাজশাহীতে ঐক্যফ্রন্টের জনসভার প্রস্তুতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।

জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এবং রাজশাহী নগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল জানান, ঐক্যফ্রন্টে স্বনামে না থাকলেও নেপথ্যে কাজ করছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলে এই সমাবেশ সফল করতে জামায়াতের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তারাও সর্বাত্মক সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে।

ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রক্রিয়ায় জামায়াতকে বাদ রাখার ব্যাপারে সরব থাকলেও গণফোরামসহ অন্য দলগুলোর কাছ থেকে এখনো এব্যাপারে কোনো বাধা আসেনি। জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা জেএসডি’র সাধারণ সম্পাদক মারুফ আহমেদ পিকু বলেন, “আমরা বলেছি সংগঠন হিসেবে তারা যেনো না থাকে। কিন্তু সমাবেশে যে কেউ অংশ  নিতে পারে। এখানে আপত্তির কিছু নেই।”

অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর যে সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে, একই ধরনের দাবি জানিয়েছে বিএনপির আরেক শরিক জামায়াতে ইসলামীও। তবে তাদের মোট দাবি আটটি, যার মধ্যে ফ্রন্টের সাতটি দাবিই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও তাদের শরিক বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের যোগাযোগ প্রকাশ্যেই। আর এই দাবি জানানোর সময় এই যোগাযোগও কাজে লেগেছে-সেটি বলেছে জামায়াতই।

বিএনপি একই সঙ্গে দুটি জোট চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলছেন, তাদের জোট জামায়াতের সঙ্গে নয়।

ঐক্যফ্রন্ট জোটবদ্ধ হওয়ার আগে ‘জামায়াত’ ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে ব্যাপক। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকলে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য নয়, এমন ঘোষণা ভুলে গিয়ে তাদের সঙ্গে জোট করেছেন ড. কামাল। এ ক্ষেত্রে যুক্তি হলো জামায়াত বিএনপির সঙ্গে আলাদাভাবে জোটবদ্ধ, কাজেই ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

গত ১৩ অক্টোবর ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা দেয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ মোট সাত দফা দাবি জানায়। আর ১২ দিন পর অজ্ঞাত স্থান থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান তুলে ধরেন আট দফা দাবি। তবে এই আট দফায় ঐক্যফ্রন্টের সাত দাবির চেয়ে আলাদা কিছু নেই। ফ্রন্টের সাত দাবিই জামায়াত আটটি হিসেবে তুলে ধরেছে।

ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর জামায়াতের ভূমিকা কী হবে, সেটা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল শুরু থেকেই। ধারণা করা হচ্ছিল, ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচি দেবে জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের শরিকরা। তবে এখন পর্যন্ত ফ্রন্টের কর্মসূচিতে জামায়াতের প্রকাশ্য অংশগ্রহণ দেখা যায়নি, যদিও ফ্রন্টের আইনজীবী শাখা ‘আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টে’ জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা যোগ দিয়েছেন।

এই অবস্থায় ঐক্যফ্রন্ট আর জামায়াতের একই দাবি তোলা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। জামায়াতের সঙ্গে ফ্রন্টের সম্পর্ক নিয়ে করা সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে।

নানা নাটকীয়তা শেষে গত ১৩ অক্টোবর ৭ দফা ও ১১টি লক্ষ্যে বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্যসহ বেশকিছু দল নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা আর জামায়াতের ৮ দফার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। কীভাবে এটা সম্ভব হলো’Ñ জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘দেশকে বাঁচাতে হলে, জনগণকে বাঁচাতে হলে, জনগণের ভোটাধিকারকে ব্যবহার করতে হলে এ দাবিগুলো আদায় করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এ দাবিগুলো এখন জনগণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমরাও করেছি।’

‘আগে থেকেই এ দাবিগুলো করে আসা হচ্ছে। ২০ দলীয় জোট, জামায়াত এবং বিএনপির পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে এ দাবিগুলো করা হয়েছে। বাস্তবতা যখন এক থাকে। তখন সবাইতো পানিকে পানিই দেখবে। একজন পানি দেখবে, আরেকজন অন্য কিছু দেখবে, তা না।’

ফ্রন্টের সঙ্গে জামায়াতের যোগাযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে এই জামায়াত নেতা বলেন, ‘যোগাযোগ তো সবার সাথেই থাকবে। রাজনীতি করলে, দেশের স্বার্থে সবার সাথে যোগাযোগ থাকে।’